পীরে ত্বরিকত পীরজাদা আলহাজ্ব মোহাম্মদ খোরশেদ উল্লাহ্ রজায়ী (প্রকাশ-রজায়ী হুজুর):
১৫ জুলাই ২০০৮ইং তারিখে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক আধ্যাত্মিক জগত” পত্রিকার ৫ম পৃষ্ঠায় খাজা গরীবে নেওয়াজ (রহ:)’র ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অবদানটি উল্লেখ করেছিলেন)
_______________________
দুনিয়ার মোহে অন্ধ মানবজাতিকে মুক্তি ও কল্যাণের পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ পাক যুগে যুগে নবী ও রাসুল (দঃ) গণকে এ ধরাধামে পাঠিয়েছেন। হযরত রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পর থেকে নবী ও রাসুল আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং হযরত রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আখেরী রাসুল হিসেবে রাব্বুল আলামীনের নিকট থেকে সনদ প্রাপ্ত হন। কিন্তু নবী এ প্রেরণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেও মানুষের তমসার রাত কেটে যায়নি। মোহান্ধ মানুষকে মিথ্যার মোহ থেকে মুক্তি দেবার জন্য আলোর দিশা দেবার জন্য পথ প্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়। মহান আল্লাহ তায়ালার এ পথ প্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়। মহান আল্লাহ তায়ালা এ পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করার জন্য যুগে যুগে হাদী বা পথ প্রদর্শক প্রেরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন। মহান আল্লাহ পাক বলেন- আমার সৃষ্টির মধ্যে এমন এক সম্প্রদায় আসবে যাঁরা পথ ভ্রষ্টদের পথ প্রদর্শন করবেন। আত্মার মুক্তি তথা মানব জীবনের সার্বিক মুক্তির জন্য আধ্যাত্মিক জ্ঞান একান্ত অপরিহার্য। মহান আল্লাহর ঘোষনা, আমি তোমাদের জন্য একটি সাধারণ পথ (শরিয়ত) এবং একটি বিশেষ পথ (মিনহাজ বা ত্বরিকত) সংশ্লিষ্ট করেছি। আল্ কুরআন। এই বিশেষ পথটি হয়েছে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পথ এবং এ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের খনি হচ্ছেন আল্লাহর ওলীগণ। আল্লাহর ওলীদের সান্নিধ্যে থেকে এ জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দ্বারা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা যায়। রিপুর আমিত্বকে জয় করা যায়, আল্লাহর রাস-ায় ফানা হবার মাধ্যমে খোদার দিদার লাভ করা যায় এবং খোদার দিদার লাভ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের পরিপূর্ণ সার্থকতা। বলা বাহুল্য মহান প্রভুর রেজামন্দি হাসিল পূর্বক তাঁর সাথে যাঁরা মহামিলনে ধন্য হয়েছেন তাঁরাই হলেন ইনসানে কামেল বা মহান ওলী। এ মহান ওলীদের অন্যতম সম্রাট হলেন শেখে ফায়াল ইউসুফে সানী জামালে মোস্তফা, শানে জামালী ও জালালী, শানে মাহবুবী ও মাশুকী, সাহেবে বেলায়েতে এজমা গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী চাঞ্জরী (রঃ)। তিনি ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন পথহারা মানুষকে। মুক্তির দিশা দেবার জন্য। মানুষের মনের মধ্যে স্রষ্টার প্রেম জাগ্রত করতে না পারলে শত ইবাদত করেও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীটি প্রণিধান যোগ্য তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাকে তোমাদের পিতা মাতা, স্ত্রী পুত্র, ধন দৌলত, আত্মীয় স্বজন এমনকি নিজ প্রাণ থেকে ও অধিক ভালবাসতে পারবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সত্যিকার মোমিন হবে না। (আল্ হাদীস)। আল্লাহ তায়ালা ও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসতে হলে হযরত করীম (সাল্লাল্লাহ আলাইহি তায়াসাল্লাম) এর নিকটবর্তীগণ তথা আহলে বাইত ও ওলীগণকে ভালবাসতে হবে। মহান আল্লাহ পাক বলেন, হে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি চাইনা তোমাদের কাছে এ বিষয়ে কোন পারিশ্রমিক, আমার নিকটবর্তীল (তথা আহলে বাইত ওলীগণ) মোয়াদ্দাত (প্রাণাধিক ভালবাসা) ব্যতীত (আল্ কুরআন)। সুতরাং এ যে ভালবাসা তা কোন বশর ভালবাসা নয় বরং ওঠা হছে স্রষ্টার ভালবাসা। মানব হৃদয়ে স্রষ্টার ভালবাসা জাগিয়ে তোলাই হচ্ছে ওলীগণের কাজ। আল্লাহর ওলীগণ হচ্ছেন নবীর প্রতিনিধিত্ব কারী বা ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া। আল্লাহর ওলীগণ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট থেকে বেলায়তের দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। জনগণকে আধ্যাত্মিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য হযরত খাজা বাবা গরীবে নেওয়াজ (রঃ) এ ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কারণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা ছাড়া নফসের আমিত্যকে বিনাশ করে আল্লাহর পথে হেদায়েত পাওয়া সম্ভবপর নয়। হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ এমন একজন ওলী যিনি জামালী, জালালী, মাহবুবী ও মাশুকী শানের অধিকারী এবং বেলায়েতে ওজমার শক্তি সম্পন্ন। তাঁর ছলক অপো জজব অবস্থার প্রাধান্য বেশী ছিল। তাই তাঁকে মজজবে ছালেক শেখ ফায়াল ওলী হিসেবে অভিহিত করা যায়। তিনি রূহানী শক্তির মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল দুরে অবস্থি ভক্ত ও মুরিদকে ফয়েজ বিতরণ করতে এরূপ মর্যাদা সম্পন্ন ওলীগণ বিনা আছবাবে ও বিনা কথাবার্তায় মুরীদগণকে শিং বা ছবক দিতে একের পর এক তাঁকে এক নজর দেখার সাথে সাথে ভক্তের হৃদয়ের সাথে তাঁর হৃদয়ের এক অভিনব সংযোগ স্পন্সিত হয়ে যেত এবং ভক্ত হেদায়েত প্রাপ্ত হত। ভালবাসা পূর্ণ হৃদয় নিয়ে এখনো যে কোন ভক্ত হযরত খাজা বাবা (রঃ) এর সাথে রূহানী সম্পর্ক পালনে সম হবে। সুতরাং শারীরীক উপাদিতে প্রয়োজনীয় নয়, আমার সার জন্য নয়। খোদার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য প্রয়োজন শুধু ভালবাসা ও একাগ্রতার। মাওলানা রুমী (রঃ) বলেন- “ভক্তি ও মুহাব্বতের সাথে একটি মহান হৃদয়ের সাথে সংযোগ পালন করলে আকবরের সাওয়াব পাওয়া যায়। কারণ হাজার হাজার কাবার চাইতে এরূপ একটি হৃদয় শ্রেষ্ট
মানুষের হৃদয়ে স্রষ্টার ভালবাসা জাগিয়ে তোলার জন্য এবং পথ ভ্রষ্টকে পথের দিশা দেবার জন্য মহান রাব্বুল আলামীন খোরাসানের অম্ল-গত চিশতান প্রদেশের সঞ্জর নামক গ্রামে আতায়ে রাসুল (সালালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিন্দল ওলী হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ (রঃ) পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয় দিক থেকে ছিলেন সৈয়দ বংশীয়। হযরত খাজা বাবা (রঃ) এর শিরা উপশিরায় সঞ্চালিত বংশ পরম্পরায় হযরত রাসুলে করিম (সালালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), হযরত আলী (রাঃ) তথা বড়পীর (রঃ) এর পুত পবিত্র রক্তধারা এবং পিতা ও মাতা উভয়কূলের
পুরুষানুক্রমে লব্ধ মহাসাধকের শি তাঁকে উন্নতির সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্টিত করানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কি এতে তিনি – হননি বরং সুগভীর সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক ও রাসুলে করিম (সালালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সন্তুষ্টি লাভ করাই ছিল তাঁর একমাত্র কামনা। সুতরাং খাজা গরীবে নেওয়াজ (রঃ) ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসুল (সালালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সান্নিধ্য লাভের জন্য পার্থিক সুখময় জীবন বিসর্জন ও লোভ লালসা ত্যাগ করে বরণ করে নিলেন কণ্টকাকীর্ণ এক দুর্গম পথ। বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের পশ্চাতে ফেলে আল্লাহ ও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর একমাত্র ভরসা করে এগিয়ে গেলেন। পুরস্কার স্বরপ পেলেন মহাসাধকের মহা গৌরবান্বিত আসন, বলে গেলেন বেগায়ভের মহান অন্যতম সম্রাট। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রঃ) যাঁর নিয়াট প্রথম ত্বরীকানী নেন্ তিনি হলেন খোরাসান ও ইরাকের মধ্যবর্তী পানে অধতি নিসাপুরের অসম্পূর্ণতি হারান নামক একটি শহরের অধিবাসী হযরত খাজা ওসমান হারানী (রঃ)। হযরত খাজা ওসমান হারানী (রঃ) হচ্ছেন হযরত আলী (কঃ) এর বংশের একাদশ অধঃ-নীয় পুরুষ এবং ওলীগনের মাথার মুকুট। সাধনায় সিদ্ধি লাভ করার পর হযরত ওসমান হারানী(র:), তাই চারকোনা তাজ মাথায় পরিয়ে দেন। উপিজির হতে শরীফ হারানী তাঁর হযরত জিলানী (রঃ) থেকে পেয়েছিলেন। টুপিটি চারকোন বিশিষ্ট হওয়ার পশ্চাতে চার প্রকারে তাৎপর্য রয়েছে তাহলো…
১. পার্থিব জগতের সকল প্রকার লোভলালসা ত্যাগ করা এবং কোন অবস্থাতেই সেগুলো মনের মধ্যে স্থান না দেয়া। লোভ লালসা মানুষের অন্তর হতে আল্লাহ ও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দূরে রাখে।
২. প্রবাত্তির তাড়না (খাহেশাতে নফস) থেকে মুক্ত থাকা। পাপের পথ থেকে দূরে থাকা। অন্যথায় মারেফতের পথে অগ্রসর হওয়া দুস্কর।
৩. স্বল্প আহার ও কম নিদ্রার অভ্যাস করা। অতি আহার ও অতি নিদ্রা আল্লাহর ইবাদতে বাঁধা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহ এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে মনকে দূরে রাখে।
৪. পরলোকের সুখ শান্তির আশা মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। জান্নাত পাওয়া কিংবা দোজখের ভয়ে ইবাদত না করে ইশকে ইলাহির জন্য সাধনা করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহ ও রাসুলের স্বাদ পাওয়া যাবে না হযরত ওসমান হারুনী (রঃ) ছাড়াও তখনকার দিনের উঁচু স্তরের ওলীয়ে কামেল শেখ নাজিমুদ্দীন কোবরা (রঃ), খাজায়ে শামসে তাবরেজ (রঃ) শেখ ইছমাইল (রঃ) শেখ এমাদ (রঃ) প্রমুখ বিখ্যাত ওলীগনের সান্নিধ্য হযরত খাজা বাবা (রঃ) লাভ করে। সর্বোপরি, তিনি হযরত বড়পীর (রঃ) সান্নিধ্য ও লাভ করেন।
◾️রজায়ী হুজুর হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ দরবার শরীফের খানেকাহ্ শরীফের খাদেমদের সাথে ২০০৫ সালে।